ক্রুসেড সিরিজ

[ক্রুসেড সিরিজ][bsummary]

স্থাপত্য

[স্থাপত্য][bigposts]

যুদ্ধের ইতিহাস

[যুদ্ধের ইতিহাস][bsummary]

এম এন রায় :একজন বাঙালি কমিউনিস্ট বিপ্লবী

আর্নেস্তো চে গুয়েভারাকে আন্তর্জাতিক বিপ্লবী বলেই সবাই চেনে। এই চে গুয়েভারার মতোই একজন বিপ্লবী এই বঙ্গভূমিতে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। কমিউনিজমের ধ্যান-ধারণা বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দিতে চেয়েছিলেন এম এন রায়।মেক্সিকো আর ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতা। এম এন রায় বা মানবেন্দ্রনাথ রায় কিন্তু তার আসল নাম নয়। তার আসল নাম ছিল নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য। বিপ্লবী কাজ করতে গিয়ে তিনি অসংখ্য ছদ্মনাম গ্রহণ করেন। মি. মার্টিন, মানবেন্দ্রনাথ, হরি সিং, ডা. মাহমুদ , মি. হোয়াইট, মি. ব্যানার্জী ইত্যাদি। তবে এম. এন. রয় নামেই মানবেন্দ্রনাথ রায় সমধিক পরিচিতি।

বিপ্লবী মানবেন্দ্রনাথ রায় বার বার ছন্দনামের আড়ালে থেকে স্বাধীনতা ও অর্থনৈতিক মুক্তির পথ খুঁজেছেন। মেক্সিকো থেকে সমাজদর্শনের যে ভাবনা তার মনোজগেক নাড়া দিয়েছিল তার অগ্নস্ফূিলিঙ্গ বপন করেছিলেন ভারত, জার্মানি, মেক্সিকো, চীন, জাপানসহ নানা দেশে। ভারতে কমিউনিস্ট আন্দোলনের পুরোধা মানবেন্দ্রনাথ রায় সোভিয়েত ইউনিয়নে বসেই দ্বিমত পোষণ করেছিলেন লেনিনের সঙ্গে। তার প্রশংসাও কুড়িয়েছিলেন। তাসখন্দের সামরিক স্কুলে প্রশিক্ষিত তরুণদের নিয়ে গঠন করেন ‘ভারতীয় মুক্তিফৌজ’।

জন্ম

১৮৮৭ সালে অবিভক্ত বাংলার ২৪ পরগণা জেলার এক ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। পড়াশোনার পাশাপাশি দ্রুতই জড়িয়ে পড়েন স্বাধীনতাকামীদের সাথে। সেকালে বাংলা মুলুকে, বিশেষ করে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে বঙ্কিমচন্দ্র বা স্বামী বিবেকানন্দের খুবই নামডাক। তাদের লেখনী পড়ে অনেক যুবা তখন স্বাধীনতা আন্দোলনে জড়িয়ে পড়বার জন্য হন্যে হয়ে উঠছে।

১৯০৫ এর বঙ্গভঙ্গ এই আগুনকে আরো উসকে দিল। এম এন রায় এই ছাত্রদের সাথে জড়িয়ে পড়েন। ক্রমে তার সাথে পরিচয় হয় বারীন ঘোষ আর তার সাঙ্গপাঙ্গদের সাথে। উল্লেখ্য, এম এন রায় সে সময়কার অনুশীলন সমিতি, যুগান্তর বা বাঘা যতীনের দলবল, সবার সাথেই কমবেশি যোগাযোগ রাখতেন। সে হিসেবে তাকে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের সশস্ত্র ধারাটির অন্যতম অংশ বললে বাড়িয়ে বলা হবে না।

ভারতে কমিউনিস্ট আন্দোলন


সময়ের প্রয়োজনে আসে বিপ্লব। বিপ্লবী মানবেন্দ্রনাথ রায় বা সংক্ষেপে এম এন রায় ভারতে কমিউনিস্ট আন্দোলনের উত্তাল ঢেউ হয়ে ফুলে-ফেঁপে ওঠেন। তার হাত ধরেই ভারত, জার্মানি ও চীনে জাগরণ ঘটে কমিউনিজম দলগুলোর। এম এন রায় ব্যারিস্টার পি. মিত্রের হাতে প্রতিষ্ঠিত জাতীয় বিপ্লববাদী দল ‘অনুশীলন সমিতি’র সদস্য ছিলেন। অস্ত্র সংগ্রহের জন্য তিনি পাড়ি দেন বিদেশে। জাপান, চীন হয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যান। এক আমেরিকান নারীকে বিয়ে করার কারণে ঘর হারান তিনি। শ্বশুরের ক্ষোভ তার ওপর। মার্কিন পুলিশের বাড়াবাড়িতে জীবন ওষ্ঠাগত হলে পালিয়ে যান মেক্সিকোতে। ১৯১৭ সালে মেক্সিকোতে গিয়ে সমাজবাদী চিন্তা তাকে নতুন করে ভাবতে শেখায়। সেখানকার সমাজবাদী দল ‘সোশ্যালিস্ট ওয়ার্কার্স পার্টিতে যোগ দেন। সেই পার্টির সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলেন এম এন রায়। ১৯১৯ সালে রুশ কমিউনিস্ট নেতা মাইকেল বরোদিনের সঙ্গে এম এন রায়ের পরিচয় হয়। কমরেড বরোদিনের কাছে রায় মার্কসবাদের শিক্ষা লাভ করেন। তিনি সোশ্যালিস্ট ওয়ার্কার্স পার্টিকেই মার্কসবাদী দলে রূপান্তরিত করেন এবং মেক্সিকোর কমিউনিস্ট পার্টি গঠনের মধ্য দিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়নের বাইরে পৃথিবীর প্রথম কমিউনিস্ট পার্টি প্রতিষ্ঠা করেন। এম এন রায় ১৯২০ সালের ১৭ অক্টোবর তাসখন্দে প্রবাসী ভারতীয় ও দুজন বিদেশি নারীকে নিয়ে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি গঠন করেন। ১৯২১ সালে এই কমিটি কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি লাভ করে। দলের জন্য অস্ত্র সংগ্রহ করতে এম এন রায় বিদেশ পাড়ি দিয়েছিলেন। অবশেষে সে অস্ত্র তিনি পেলেন সোভিয়েত সরকারের কাছ থেকে। সোভিয়েত সরকার প্রদত্ত দুই ট্রেন ভর্তি অস্ত্রশস্ত্র, সাঁজোয়া গাড়ি, এরোপ্লেনের খোলা অংশসমূহ, রসদ, ধন-ভাণ্ডার, সৈন্য, প্রশিক্ষক প্রভৃতি সঙ্গে নিয়ে রায় তাসখন্দে পৌঁছেন। এর আগে আফগানিস্তান হয়ে ভারত থেকে আগত বিপ্লবীদের (মুহাজির) প্রশিক্ষণের জন্য সামরিক স্কুল খোলা হয়। রায় তার সঙ্গে আগত ও তাসখন্দের সামরিক স্কুলে প্রশিক্ষিত তরুণদের নিয়ে গঠন করেন ‘ভারতীয় মুক্তিফৌজ’।

 

লেনিনের থিসিস গ্রহণ করেননি

১৯২০ সালের কথা। এম এন রায় লেনিনের আমন্ত্রণে চলে আসেন মস্কোতে। কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের দ্বিতীয় কংগ্রেসে রায় সবাইকে বিস্মিত করেন তার বক্তব্যে। পরবর্তীতে রায়ের এ থিসিসটি কংগ্রেসে লেনিনের থিসিসটির পরিশিষ্ট হিসেবে গ্রহণ করা হয়। মি. রায়ের বিশ্লেষণী বক্তব্য ও স্বাধীন চিন্তার প্রতিফলন সত্যিকার অর্থের সবাইকে নতুন করে ভাবতে সাহায্য করে। এ ঘটনার পর লেনিন ও অন্য মার্কসবাদী নেতাদের কাছে রায়ের আলাদা অবস্থান তৈরি হয়। সেখানে রায়ের সঙ্গে লেনিন, ট্রটস্কি, জিনোভিয়েভ ও পরবর্তীতে স্ট্যালিনের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়। তবে সবকিছুকে ছাপিয়ে যায় রায় ও লেনিনের সাক্ষাতের ঘটনা। এ ঘটনা সম্পর্কে বহুল প্রচলিত একটি বক্তব্য রয়েছে যে, সাক্ষাতের সময় লেনিন তার ঔপনিবেশিক সংক্রান্ত থিসিসটি রায়ের হাতে তুলে দিয়ে এ সম্পর্কে তার দৃষ্টিভঙ্গি জানাতে বলেন। উপনিবেশগুলোর বৈপ্লবিক কৌশল সম্পর্কে লেনিন যে থিসিস লিখেন তার সঙ্গে রায় একমত পোষণ করেননি। তার সমালোচনার খবর গোপন ছিল না। লেনিন তখন রাশিয়ার সর্বাধিপতি ও কমিউনিস্ট জগতে তার প্রভাব সবচেয়ে বেশি। তার সঙ্গে ভিন্ন মত পোষণ করার কথা রাশিয়ায় তখনকার মতো কারও চিন্তায়ও আসেনি। কিন্তু রায় দ্বিমত পোষণ করলে পরিস্থিতি ভিন্ন হয়ে ওঠে। কমিউনিস্ট পার্টির ইতিহাসে লেনিনের পরই রায়ের স্থান— যিনি মার্কসবাদের সংশোধন করার চেষ্টা করেছিলেন।


মলাটবন্দী দর্শন

এম এন রায় অসংখ্য প্রবন্ধ লিখেছেন। ১৭টি ভাষায় দক্ষ ছিলেন। তার রচিত ৬৭টি গ্রন্থ ও ৩৯টি পুস্তিকার কথা জানা যায়। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ‘নিউ হিউম্যানিজম’ (১৯৪৭), মাই মেমোয়ার্স (১৯৫৪), রেভলিউশন অ্যান্ড কাউন্টার রেভলিউশন ইন চায়না, রিজন রোমান্টিসিজম অ্যান্ড রেভলিউশন ইত্যাদি। ‘ইন্ডিয়া ইন ট্রানজিশন’ গ্রন্থটি বিপ্লবী অবনী মুখার্জির সঙ্গে মিলিতভাবে রচিত। শিবনারায়ণ রায়ের সম্পাদনায় Selected Works of M.N. Roy (1932-1936) চারখণ্ডে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে প্রকাশিত হয়েছে।

 

ভারতে বিপ্লবীর নতুন যুগ

ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতা সেক্রেটারি ছিলেন এম এন রায়। লেনিনের সঙ্গে মতপার্থক্যের জের তখনো প্রবলভাবে ছিল রায়ের। ১৯২২ সালে তৃতীয় বিশ্ব আন্তর্জাতিক অধিবেশনে তা আবারও স্পষ্ট হয়। লেনিন গান্ধীকে বিপ্লবী আখ্যা দিয়ে মূল্যায়ন করতেন, যা মেনে নেননি এম এন রায়।  গান্ধীকে রায় বরাবরই ধর্মীয় আর সামাজিকভাবে আদর্শ হিসেবে ব্যাখ্যা দিলেও বিপ্লবী আখ্যা দেননি।

অবশ্য এর আগের বছর অর্থাৎ ১৯২১ সালে তাসখন্দে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি আন্তর্জাতিকের অনুমোদন পায়। ভারতের পরপরই এই পার্টির কাজ জার্মানিতে সম্প্রসারিত হয়। এখানেও এম এন রায়ের ভূমিকা ছিল চোখে পড়ার মতো। জার্মানি থেকে ১৯২২ সালের ১৫ মে পার্টির পত্রিকা প্রকাশিত হয়। এ পত্রিকা ডাকযোগে ভারতের বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন ব্যক্তির নামে পাঠানো হতো। ১৯২৪ সালে তিনি কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের সভাপতিমণ্ডলীর সম্পাদক হন। ১৯২৪-১৯২৭ সাল পর্যন্ত তিনি পশ্চিম ইউরোপে ছিলেন। সেখানে থাকার সময় তিনি জার্মানি ও ফ্রান্সে কমিউনিস্ট আন্দোলন পরিচালনার কাজ করেন। ১৯২৬ সালের নভেম্বর মাসে কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকে কার্যকরী সমিতির এক সভা বসে। এ অধিবেশনে এম এন রায় আবারও সভাপতি নির্বাচিত হন।

১৯২৭ সালের মে মাসে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির পঞ্চম কংগ্রেসে তার পরামর্শ গৃহীত হয়। চীন থেকে তিনি বার্লিন ও মস্কোতে যান। সেখানে এক বছর কাটান। এ সময় ইভলিন ট্রেন্টের সঙ্গে তার বিবাহ বিচ্ছেদ হয়। তিনি মস্কোতে ফিরে আসেন।

সেখানে আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট সংস্থার সভায় যোগদান করেন।

১৯৩০ সালের ডিসেম্বরে তিনি ভারতে চলে আসেন। আত্মগোপনে থাকা অবস্থায় তিনি শ্রমিক ও কৃষক আন্দোলনকে সংগঠিত করেন। ১৯৩১ সালের ২১ জুলাই বোম্বের এক হোটেল থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়। এ সময় পুলিশ তার বিরুদ্ধে কানপুর যড়যন্ত্র মামলা (১৯২৪) দায়ের করে। তাকে ১২ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। পরে আপিল করা হলে আপিলে তার সাজা ছয় বছর হয়। তিনি জেলখানায় বসে প্রচুর পড়াশোনা এবং লেখালেখি করেন।

জেলখানাতে বসেই বিভিন্ন বিষয়ে প্রবন্ধ ও বই রচনা করেন। মুক্তি পাওয়ার পর তিনি বোম্বাই থেকে ‘Independent India’ নামে একটি সাপ্তাহিক ইংরেজি পত্রিকা প্রকাশ করেন। এই পত্রিকায় তিনি সমসাময়িক রাজনৈতিক প্রসঙ্গ নিয়ে লিখতেন। ১৯৩৬ সালের ডিসেম্বরে এম এন রায় কংগ্রেসে যোগদান করেন। কিন্তু কংগ্রেসে মার্কসবাদ সুবিধা করতে পারেনি। জনমানুষের তাৎপর্য বুঝে উঠতে পারেনি। যে কারণে গান্ধীর সঙ্গে এম এন রায়ের মতপার্থক্যের বিষয়টি আরও প্রকট হয়ে ওঠে।

 

ছদ্মনামের আড়ালে বিপ্লবীর মুখ

তার আসল নাম ছিল নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য। বিপ্লবী জীবন বেছে নেওয়ায় বার বার নামও বদলাতে হয়েছে। দেশ ছেড়ে ঘুরে বেড়িয়েছেন। কখনো তাকে সবাই চিনেছে মি. মার্টিন নামে। হরি সিং, ডা. মাহমুদ, মি. হোয়াইট, মি. ব্যানার্জি এসব নামের আড়ালে তার মুখই ছিল। তবে এম এন রায় নামেই মানবেন্দ্রনাথ রায় সবচেয়ে বেশি পরিচিতি লাভ করেন। ১৯২০ খ্রিস্টাব্দের ১৭ অক্টোবর সোভিয়েত ইউনিয়নের তাসখন্দে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি গঠন করেন। তিনি সমাজতাত্ত্বিকদের কাছে ‘র‌্যাডিক্যাল হিউম্যানিস্ট’ হিসেবে পরিচিত। বিপ্লবী জীবনে বার বার গ্রেফতার হয়েছেন। রাজনৈতিক ডাকাতিতে অংশ নেওয়ার সন্দেহে পুলিশ গ্রেফতার করলেও প্রমাণিত না হওয়ায় তিনি ছাড়া পান।

 

নিউইয়র্কে গ্রেফতার

বিপ্লবী জীবনে নানা দেশে ছুটে বেড়িয়েছেন। অস্ত্র সংগ্রহে দেশ থেকে দেশে ঘুরেছেন। বলিভিয়া গিয়েছিলেন মি. মার্টিন নামে। ১৯১৫ সালে ফিলিপাইনে গিয়েছিলেন। সেখান থেকে জাপানে। ১৯১৬ সালে নিউইয়র্ক চলে আসেন তিনি। এখানেই দেখা হয় লালা লাজপতি রায়ের। লালাজি ছিলেন একজন মার্কসপন্থি। এখানে এসে রায় মার্কসবাদের সঙ্গে পরিচিত হন এবং মার্কসবাদ চর্চা শুরু করেন।  একদিন কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে একটি সভা শেষ করে ফেরার পথে গ্রেফতার হন। জামিনে ছাড়া পাওয়ার পর মার্কিন গোয়েন্দাদের চোখে ধুলো দিয়ে মেক্সিকোতে পালিয়ে যান।


মেক্সিকোতে ব্যাপক পরিচিতি

সব হিসাব পাল্টে যায় নিউইয়র্কে গ্রেফতার হওয়ার পর। মার্কসবাদের প্রতি অনুরক্ত থাকায় নিউইয়র্কে গ্রেফতার হওয়া, তারপর জামিনে ছাড়া পেয়ে পালিয়ে আসেন মেক্সিকোতে। এখানে এসে কিছু দিনের মধ্যে ব্যাপক পরিচিতি পান এম এন রায়। তিনি স্পেনিশ ভাষা শিখে মেক্সিকোর পত্রিকায় লেখালেখি করেন। অল্প সময়ের ব্যবধানে মেক্সিকোর বুদ্ধিজীবী, রাজনীতিবিদদের মধ্যে তার নাম ছড়িয়ে পড়ে। এরপর কিছুদিনের মধ্যে সেখানকার রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে জড়িয়ে পড়েন। ১৯১৭ সালে মেক্সিকোতে মার্কিন আগ্রাসন মোকাবিলা করতে সোশ্যালিস্ট পার্টি গড়ে তোলেন এম এন রায়। সোশ্যালিস্ট পার্টির হয়ে তিনি একটি মেনিফেস্টো তৈরি করেন। এই মেনিফেস্টো ছিল শ্রমজীবী ও মেহনতী মানুষের জন্য।

তাদের দুঃখ, অর্থনৈতিক বৈষম্যের দিকে লক্ষ্য রেখে করা মেনিফেস্টো গোটা মেক্সিকোতে সাড়া ফেলে দেয়। রাশিয়াতে ওই সময় লেনিনের নেতৃত্বে সমাজতন্ত্র কায়েম হয়। যে কারণে তার মেনিফেস্টো থেকে মানুষ স্বপ্নকে বাস্তবে দেখতে শুরু করে। আন্দোলনের ঢেউ বয়ে যায় মেক্সিকোতে। শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে ব্যাপক সমর্থন পায়। ১৯১৮ সালে মেক্সিকোর সোশ্যালিস্ট পার্টির প্রথম সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সর্বসম্মতি ক্রমে রায় পার্টির জেনারেল সেক্রেটারি নিযুক্ত হন। ওই সম্মেলনে আরেকটি কমিটি গঠন করা হয়। দক্ষিণ ও মধ্য আমেরিকার দেশগুলোর প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি ল্যাটিন আমেরিকান লীগ গঠন করা হয়। সেখানে আহ্বায়ক কমিটির সম্পাদক হিসেবে নির্বাচিত হন তিনি। ১৯১৯ সালে রায় মাইকেল বরোর সহযোগিতায় সর্বসম্মতি ক্রমে সোশ্যালিস্ট পার্টিকে কমিউনিস্ট পার্টিতে রূপান্তরিত করেন। এটাই ছিল রাশিয়ার বাইরে পৃথিবীর সর্বপ্রথম কমিউনিস্ট পার্টি।

 

 

গান্ধীর সঙ্গে মতপার্থক্য

কংগ্রেসে মার্কসবাদ কখনোই মাথা তুলে দাঁড়াতে পারেনি। আর শুরু থেকেই এম এন রায়ের সঙ্গে গান্ধীর মতপার্থক্য দেখা গিয়েছিল। এরই মধ্যে দেখা গেল নতুন সমীকরণ। ১৯৩৮ সালে কংগ্রেসের ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠকে গান্ধীকে সব ক্ষমতা অর্পণ করা হয়। এখানেই থেমে থাকেনি। ত্রিপুরা কংগ্রেসে সুভাষ বসু সভাপতি নির্বাচিত হন। এর ফলে সৃষ্টি হয় গান্ধীবাদীদের চরম বিরোধিতা। পরে সুভাষ বসু পদত্যাগ করেন কংগ্রেস থেকে। এই টানা সংকট মেটাতে পরের বছর ১৯৩৯ সালের ২৬ মার্চ কংগ্রেসের অভ্যন্তরে ‘লীগ অব র‌্যাডিক্যাল কংগ্রেসমেন’ নামে এক সংহতি গঠন করা হয়। আশা করা হয়েছিল এতে পরিস্থিতি কিছুটা হলেও সামাল দেওয়া যাবে। কিন্তু তা হয়নি। ১৯৪০ সালের অক্টোবরে এম এন রায় কংগ্রেস থেকে পদত্যাগ করেন। একই বছর ‘লীগ অব র‌্যাডিক্যাল কংগ্রেসমেন’-এর সিদ্ধান্ত হয় লীগের সবাই কংগ্রেস থেকে পদত্যাগ করবেন এবং সংগঠনের নতুন নাম হবে ‘র‌্যাডিক্যাল ডেমোক্রেটিক পিপলস পার্টি’। নাম পরিবর্তনের পাশাপাশি আন্দোলনের রূপ পাল্টায়। তার দুই বছরের মাথায় ভারত ছাড় আন্দোলনের বিরোধিতা করে বসেন এম এন রায়। ১৯৪২ সালে কংগ্রেসের ‘ভারত ছাড়’ আন্দোলনের বিরোধিতা করার কারণে এম এন রায় ও র‌্যাডিক্যালদের অনেক নির্যাতন সহ্য করতে হয়।

১৯৪৪ সালে র‌্যাডিক্যাল পার্টির দ্বিতীয় সম্মেলনে স্বাধীন ভারতের সংবিধানের খসড়া গৃহীত হয়।

আবার ভারত

১৯৩০ সালে, প্রায় ১৬ বছর পর এম এন রায় ভারতে ফিরলেন। যদিও নেহেরু বা সুভাষ চন্দ্র বোস তাকে বিশেষ সমাদর করলেন, কিন্তু এটাও পরিষ্কার হয়ে গেলো যে তারা তাকে জায়গা ছেড়ে দেবেন না। ওদিকে গান্ধীর সাথে তার বনে না। ব্রিটিশ পুলিশ তো ওঁত পেতেই ছিল। দেশে ফেরার কয়েক মাসের মধ্যে তাকে জেলে পোরা হয়। প্রহসনের বিচার শেষে জেল খাটতে হয় ছয় বছর। এতেই রায়ের শরীর একদম ভেঙে পড়ে। তিনি আরো অসংখ্য কম্যুনিস্ট নেতাদের মতো বারবার কোন্দল না পাকিয়ে বরং কম্যুনিস্টদের আহ্বান করেন যেন তারা ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসে যোগ দেয়। এতে করে ডাকসাইটে কম্যুনিস্টদের সাথে তার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তবে এরই মধ্যে তিনি ১৯৩৪ সালে ভারতীয় গণপরিষদ গঠনের দাবি জানান। পরে কংগ্রেস এই দাবি নিয়ে আন্দোলন শুরু করে। 
দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ বাঁধলে এম এন রায় ভারতীয়দেরকে আহ্বান জানান যেন তারা ব্রিটিশদেরকে সাহায্য করে। রায়ের বক্তব্য ছিল, ফ্যাসিস্ট বা নাজী সরকার যুদ্ধে জিতলে ভারত আর কোনোদিনই স্বাধীনতা পাবে না। ওদিকে গান্ধী ১৯৪২ সালে ভারত ছাড় আন্দোলন শুরু করেন, সুভাষ বোস জাপানী আর জার্মানদের সাহায্য নিয়ে গড়ে তোলেন আজাদ হিন্দ ফোর্স। কম্যুনিস্ট বা কংগ্রেসীরা রায়ের এই পথ পরিবর্তন ভালো চোখে দেখেনি। অনেকটা এই সময়েই রায় 'নিও হিউম্যানিজম' নামের একটি নতুন তত্ত্ব হাজির করেন। মূলত কংগ্রেস আর কম্যুনিস্টদের সাথে মতের মিল না হওয়াতেও এই নতুন তত্ত্ব।
এম এন রায়; Image Source: The Logical Indian
এম এন রায় র‍্যাডিক্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টি নামে দল গঠন করে নিজের তত্ত্ব প্রচার করা শুরু করেন। তার বিখ্যাত 'রিজন, রোমান্টিসিজম অ্যান্ড রেভল্যুশন’ গ্রন্থে তিনি নিজের নিও হিউম্যানিজম নিয়ে নতুন ধারার একটি রাজনৈতিক আন্দোলন গঠনের প্রয়াস পান। এটি মূলত মানবিক গুণাবলী দ্বারা পরিচালিত ধর্মনিরপেক্ষ একটি সমাজ গঠনের প্রয়াস পেত, যেখানে জ্ঞান, মুক্তি আর স্বাধীনতাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। উল্লেখ্য, আন্তর্জাতিক হিউম্যানিস্ট আন্দোলনের অপেক্ষাকৃত র‍্যাডিক্যাল ঘরানাটিই রায়ের নিউ হিউম্যানিজমের সারবত্তা।

স্বাধীন ভারতে এম এন রায়কে খুব উঁচুদরের তাত্ত্বিক হিসেবে প্রচুর সম্মান দেখানো হলেও রাজনৈতিকভাবে তিনি একরকম শক্তিহীন হয়ে পড়েন। শারীরিকভাবেও হয়ে পড়েছিলেন অসুস্থ। কম্যুনিস্টদের মধ্যে বহু ভাঙনের ফলে কংগ্রেসই ভারতের সবথেকে শক্তিশালী রাজনৈতিক দল হিসেবে আবির্ভূত হয়। বাঙালি বিপ্লবী মানবেন্দ্রনাথ রায় ১৯৫৪ সালে দেরাদুনে মৃত্যুবরণ করেন। তাবত বিশ্ব ঘুরে যে বিপ্লবের স্বপ্ন তিনি দেখেছিলেন, তা অনেকাংশেই সাকার না হওয়ার ফলেই বোধহয় বিস্মৃত হয়ে পড়েছেন আধুনিক রাজনীতির পাঠে।

No comments:

Post a Comment